পাহাড়ের টানে
এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ মিলছিলোনা। আমার ছেলেরা অনলাইন ক্লাস ও তাদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, তাই ভাবছিলাম কোথাও আর যাওয়া হবে কি না। অগাস্টের শেষ দিকে ওদের কলেজ শুরুর আগ দিয়ে সপ্তাহ খানেক সময় পাওয়া গেলো। আমরা সবাই ঠিক করলাম এবার কলোরাডো স্প্রিংস এ বেড়াতে যাবো। কলোরাডো স্প্রিংস আমেরিকার কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত একটি বৃহত্তম জনবহুল শহর।
পনেরো বছর আগে ২০১১ সালে প্রথম আমাদের কলোরাডো স্প্রিংস এ যাওয়া হয়েছিলো। আমার বাচ্চারা তখন অনেক ছোটো। এ জায়গার প্রধান দুটি আকর্ষন 'পাইকস পিক' পর্বত চূড়া এবং 'গার্ডেন অফ দ্য গডস' পার্কে গিয়েছিলাম এবং ওগুলোর অপূর্ব সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। পনেরো বছর পরে কলোরাডো স্প্রিংসে ফেরত এসে দেখলাম, এর অভাবনীয় সৌন্দর্য একটুও কমেনি।
পাহাড় ও সমুদ্রের মধ্যে একটাকে বেছে নিতে বললে আমি বরাবর পাহাড়কে বেছে নেবো । পাহাড় আমায় টানে। পাহাড়ের কাছাকাছি গেলে এর বিশালতা দেখে মনে হয়, সারা বিশ্বে আমরা এতই ছোট, এতই নগণ্য, যে আমাদের অস্তিত্ব এই প্রকৃতির মাঝে কিছুই না। তাই জীবনে হা হুতাশ করার কোনও মানেই হয়না। পাহাড় আমাদের বিনয়ী হতে শেখায়। পাশাপাশি, পাহাড়ের কাছে গেলে মন হয় উদার, প্রশস্ত। বিশ্বসৃষ্টির মহিমা দেখে মনের সংকীর্ণতা দূর হয়।কলোরাডো স্প্রিংস এর খুব কাছে অবস্থিত রকি পর্বতমালার সবচেয়ে বিখ্যাত পর্বতশৃঙ্গ 'পাইকস্ পিক', যা কিনা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪,১১২ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। এটিকে 'আমেরিকার পর্বত' ডাকা হয় এবং এই পাহাড়টি ট্যুরিস্টদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় ও ভ্রমণকৃত। এই পাহাড়ের চূড়ায় দুই ভাবে যাওয়া যায়। উনিশ মাইল লম্বা পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে অথবা কগ রেলগাড়িতে চড়ে, যা ১৮৯১ সাল থেকে চালু আছে।
গতবারের মত এবারেও আমরা রোমাঞ্চকর কগ রেলওয়েতে করে পাহাড়ি রাস্তা ধরে উপরে উঠলাম। দেখলাম দুই ধারের মনোরম সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। দেখলাম আকাশ, পাহাড়, উপত্যকার এক অপূর্ব মিতালি। নীল আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের পুঞ্জভেলা, ভেসে চলে এপাশ থেকে ওপাশ। এক পাহাড়ের চুড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় অন্য পাহাড়ের মাথায় জমাকৃত বরফের রাশি। পাহাড়ের খাঁজে রয়েছে অপূর্ব সুন্দর নীল পানির অ্যালপাইন হ্রদ। সূর্যের আলো পড়ে যা চকচক করে। ওখানে করা যায় ফিশিং, বোটিং, কায়াকিং। দূরে পাহাড়ের ঢালে দেখা যায় নানা রকমের পাহাড়ি বন্য প্রাণী বিগ হর্ন শিপ, এল্ক, মারমট, কখনো কখনো মাউন্টেন লায়ন।
পাহাড়ের পাদদেশে গরম অনুভব হলেও ১৪,০০০ ফুট উঁচুতে তাপমাত্রা অনেক কম, তাই বেশি ঠাণ্ডা অনুভূত হয়। আমাদের সবার সাথে গরম কাপড় ছিলো। এতো উচ্চতায় বাতাস পাতলা হওয়ায় তাতে অক্সিজেন সরবরাহ কম থাকে। ছেলেরা সবাই ঠিক ছিলো, তবে আমার শ্বাসকষ্ট হচ্ছিলো, একটু একটু মাথাও ঘুরাচ্ছিল। পাহাড়ের মাথায় আছে একটা চমৎকার সুন্দর ভিজিটর সেন্টার। যেখান থেকে সমগ্র স্টেটের এক নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখা যায়।
ঐ ভিজিটর সেন্টারের সবথেকে বড় আকর্ষণ পাইকস পিক পাহাড়ের মাথায় তৈরি গরম গরম ডোনাট। এখানে তৈরি ডোনাট এর সাথে অন্য জায়গার ডোনাটের বিশাল পার্থক্য হলো এগুলো একটি বিশেষ রেসিপি দিয়ে তৈরি করা হয়। অতিরিক্ত উচ্চতায় বাতাসের চাপ কম থাকে এবং পানি কম তাপমাত্রায় ফোটে। তাই ডোনাট বানানোর সাধারণ রেসিপি এখানে ব্যবহার করা যায়না। ১৯১৬ সাল থেকে ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই বিশেষ রেসিপি দিয়ে ভিজিটরদের জন্য ডোনাট তৈরি করা হয়। মজার ব্যাপার হোলো, ডোনাট এখানে বসে না খেয়ে পাহাড়ের নীচে শহরে নিয়ে গেলে কম উচ্চতায় ও অতিরিক্ত বাতাসের চাপে তা ফোলা ভাব হারিয়ে চুপসে যায় এবং চ্যাপ্টা, শক্ত হয়ে যায়।
পাহাড়ের চূড়ায় বসে চারিদিকের শীতল পরিবেশে আমরা কফি ও সিনামন সুগার (দারুচিনি চিনির মিশ্রণ) ছিটানো পাইকস পিকের বিশেষ ডোনাট খেয়েছি। ততক্ষণে আমার শ্বাসকষ্টও কমে এসেছে। সেন্টারের বাইরে এসে যখন ফিরতি ট্রেনে ওঠার জন্য দাঁড়িয়েছি তখন চারিদিকে হালকা বৃষ্টি শেষে আকাশে রংধনু উঠেছে। ১৪,০০০ ফুট উপরে আকাশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিলো, হাত বাড়ালেই ঐ রংধনু আমার হাতের মুঠোয় চলে আসবে। বে-নী-আ-স-হ-ক-লার সাতটি রং পাশাপাশি দাঁড়িয়ে একটি অর্ধ বৃত্তাকার ভঙ্গিতে নীল আকাশকে আলিঙ্গন করছে।
কলোরাডোর বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক গার্ডেন অফ দ্য গডস পাবলিক পার্কটি বিশ্বজুড়ে 'ন্যাশনাল ন্যাচারাল ল্যান্ডমার্ক' হিসেবে পরিচিত। পার্ক জুড়ে ছড়িয়ে আছে লালবেলে পাথর দিয়ে তৈরি বিভিন্ন আকৃতি ও গঠনের বিচিত্র সব শিলাস্তুপ। এই শিলাস্তুপগুলি ৩০০ মিলিয়ন বছরেরও বেশি পুরানো। ভৌগলিক পরিবর্তনের কারনে মাটির নীচে টেকটনিক প্লেটের নড়াচড়া ও উত্থানের কারনে পর্বত গঠন হয়। তারই ফলশ্রুতিতে মাটির নীচ থেকে এই পাথুরে পাহাড়গুলি বেড়িয়ে এসেছে এবং মিলিয়ন মিলিয়ন বছর ধরে খাড়া দাঁড়িয়ে আছে। এক একটি পাথর এক এক আকৃতির এবং প্রত্যেকের বিশেষ নামও আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পাথরটির নাম 'ব্যালেন্সড রক'। এই রকটি দেখলে মনে হবে খুব বড় একটি পাথরের চাই, একটি সরু ভিত্তির উপর কোনো এক অলৌকিক উপায়ে বসে আছে এবং একটুও নড়ে যাচ্ছেনা।
পার্কের মধ্যে দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রায় একুশ মাইল দীর্ঘ হাঁটার রাস্তা আছে। আমার ছেলেরা আর ছোটো নেই তাই এবারে আর গাড়ি দিয়ে নয়, বরং হেঁটে হেঁটে ঐ লাল পাহাড়গুলো উপভোগ করলাম। হাঁটার পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দর্শনার্থীদের জন্যে আছে হাইকিং, বাইকিং, রক ক্লাইম্বিং এর সুযোগও রয়েছে। পার্কে দাঁড়িয়ে দূরে দেখা যায় তুষারাবৃত পাইকস পিক পর্বতের চূড়া।
পার্কের দক্ষিন পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এ শহরের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম গিফট শপ, গার্ডেন অফ দ্য গডস ট্রেডিং পোস্ট। প্রায় ২৫,০০০ বর্গফুটের এই বিশাল দোকানটিতে ৯০,০০০ এর বেশি উপহার সামগ্রী পাওয়া যায়। এখানে আদিবাসি আমেরিকানদের তৈরি বিভিন্ন হস্তশিল্প, গহনা, শিকারের হাতিয়ার, নাভাহো কার্পেট, পুয়েবলো আদিবাসিদের রন্ধনশিল্প এবং এই অঞ্চলের শিল্পীদের আঁকা চিত্রকর্ম পাওয়া যায়। তাছাড়া কলোরাডো থিমের বিভিন্ন টি শার্ট, মগ, টুপি, পোস্ট কার্ড, বই, হোমডেকোর পাওয়া যায়। ঐ বিশাল গিফট শপের এক প্রান্তে আছে একটি খাওয়ার ক্যাফে। মহিষ বা বাইসনের মিট দিয়ে তৈরি ঐ ক্যাফের বার্গার টুরিস্টদের মধ্যে খুবই পপুলার। দোকানের দুই তৃতীয়াংশ জুড়ে আছে কাপড়, হরেক রকমের স্যুভেনির, রান্নাঘর ও ঘর সাজানোর জিনিস।
আমি যে জায়গায় বেড়াতে যাই, সাধারণত সেই জায়গার স্থানীয় শিল্পকর্ম বা হাতের তৈরি জিনিস সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। বিভিন্ন জায়গার স্যুভেনির বা স্মারক আমাকে ঐ জায়গার সমাজ, সংস্কৃতি, বা ইতিহাসের সাথে পরিচিত করে। আমি ঘুরে ঘুরে জিনিসগুলি দেখছি আর ভাবছি কলোরাডো থিমের কি কিনলে ভালো হয়। হঠাত চোখে পড়লো, বেশ কিছু সুন্দর টেবিল ম্যাট, সম্পুর্ন পাটের তৈরি। গোল, ওভাল, চারকোনা আকৃতির। জুটের বোনা প্লেইস ম্যাটগুলোর উপর শোভা পাচ্ছে কলোরাডো স্টেটের স্থানীয় পশু, পাখি, গাছ ও ফুলের রঙ্গিন প্রতিকৃতি। টেবিল ম্যাটগুলি আমার খুব পছন্দ হলো। পাট বা জুটের তৈরি জিনিস আমার খুব পছন্দের।ম্যাটগুলো উল্টিয়ে কোথাকার তৈরি বা মেইড ইন দেখতে ইচ্ছুক হলাম। ট্যাগ পড়ে আমি একেবারে হতবাক - মেইড ইন বাংলাদেশ। গর্বে আমার বুক ভরে গেলো। বাংলাদেশের পাট শিল্পের কথা আগেও শুনেছি। পাটকে বাংলাদেশের সোনালি আঁশ বলা হয়। বিশ্ব বাজারে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে আছে। এই শিল্পের সাথে লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও কর্মসংস্থান জড়িত।
বাংলাদেশের প্রধান পাঁচ রপ্তানি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাকের পরপরই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, পাট ও পাটজাত পণ্য। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। কাঁচা পাট, পাটের সুতা, পাটের ব্যাগ, বস্তা, কার্পেট, এবং পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটজাত পণ্যের চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন বা একশো কোটি মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।
আমি কয়েকটা ম্যাট তুলে নিলাম কিনবো বলে। কাউন্টারে গিয়ে মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'তুমি কি জানো, এই ম্যাটগুলো কোথাকার তৈরি।' মেয়েটা বলল, 'হতে পারে ইন্ডিয়া।' আমি হেসে বললাম, 'ইন্ডিয়া নয়, এটা আমার দেশ বাংলাদেশের তৈরি।' মেয়েটা বলল, 'রিয়ালি, হাউ বিউটিফুল।'
আমি সুন্দর করে বুঝিয়ে বললাম, 'আমার দেশের গ্রামের কর্মজীবী নারীরা তাদের শ্রম, ত্যাগ, ধইর্য্য ও ভালবাসা দিয়ে এইসব হস্তশিল্প তৈরি করে। অনেক সময় তারা ঘরে বসে বানায়, আবার অনেক সময় তারা দলবদ্ধ ভাবে গ্রামের কোনও বড় উঠোনে বা চালাঘরে বসে এইসব হাতে তৈরি শৌখিন জিনিস তৈরি করে। এগুলো বানিয়ে ওরা যা উপার্জন করে সেই অর্থ দিয়ে সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালায়, স্বামীর উপার্জনে সহযোগিতা করে, সংসারের অবস্থার উন্নতি করে। এই কাজের মাধ্যমে তারা অর্থনইতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়।' মেয়েটা মন দিয়ে শুনছিল।আমি আরও বললাম, 'তবে এখানে একটা আশ্চর্যের ব্যাপার আছে। ইম্পর্টিং কোম্পানি বা বাইয়ার কোম্পানি বিদেশ থেকে আসা বড় বড় অর্ডার সুদূর গ্রামেগঞ্জে পাঠায়। বিভিন্ন এনজিও সংস্থার মাধ্যমে সেই অর্ডারগুলো এসব মহিলাদের হাতে আসে। এই মহিলাগুলো হয়তো কোনোদিন গ্রামের বাইরে ঢাকা শহরেই যায়নি। দেশের বাইরে বা বিদেশ, আমেরিকায় যাওয়ারতো প্রশ্নই উঠে না। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরে বসে এক অজানা, অচেনা অপরিচিত জায়গা বা অঞ্চলের পরিবেশ, প্রাণী, প্রকৃতি, কি সুনিপুণ দক্ষতায় তারা সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছে তাদের হাতে বোনা জিনিসগুলোর মাধ্যমে। দেখে মনে হবে, ঐ অঞ্চলেরই কোনও স্থানীয় পেশাদার লোকের কাজ।' মেয়েটা বলল, 'কি সাংঘাতিক দারুণ।'
সবশেষে বললাম, 'আর মহিলাগুলো জানতেও পারছেনা, হাজার মাইল দূরে বসে বিদেশের এক দোকানের শেলফে ওদের তৈরি জিনিসগুলো দেখে ওদেরই কোন এক দেশীবোন আনন্দিত হচ্ছে, গর্বিত হচ্ছে।' কথাটা শুনে মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, 'কি দারুণ ভালোবাসা তোমার দেশের প্রতি।'


I am sure it was an amazing experience and a proud moment to discover the handmade artistic crafts from Bangladesh. In Colorado
ReplyDelete