অচেনা আমেরিকা
আমেরিকা নামটি শুনলেই মাথায় চলে আসে কিছু কথা, অর্থনৈতিক মন্দা, সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক বিভাজন, অভিবাসী আতংক, ইত্যাদি, ইত্যাদি। আমেরিকা নামটি শুনলে আর অজান্তেই মনে আসেনা, কোনো স্বপ্ন পূরণের উত্তেজনা, নিত্যজীবন ধারণের অনুপ্রেরণা, কোনো আনন্দ, কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা, কোনো নিশ্চয়তা। কিছু দিনের মধ্যেই আমেরিকা দেশটি তার ২৫০তম জন্মবার্ষিকি পালন করবে। কিন্তু অবাক ব্যাপার, পুরো দেশ জুড়ে সারা দেশের মানুষ কোনো খুশির জোয়াড়ে ভাসছেনা। স্বপ্নের এই দেশটি কেমন বদলে গেলো। আমি যখন প্রথম এই দেশে আসি সেই আগেকার প্রিয় আমেরিকাকে আর খুঁজে পাইনা। পতাকার রংটা লাল-সাদা-নীল একই থাকলেও, দেশের রংটা কেমন যেন ফিকে হয়ে গিয়েছে। উজ্জ্বলতা নেই, প্রখরতা নেই।
পেছনে তাকিয়ে তিন দশক আগের স্মৃতি রোমন্থন করছি। ১৯৯২ সালে আমার প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে আগমন। দুচোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম। ছোটবেলা থেকেই প্রবল ইচ্ছা ছিলো বিদেশে পড়তে যাওয়ার। আর সেটা যদি হয় আমেরিকা, তাহলেতো আমার স্বপ্ন পূরণ হবে দ্বিগুণ। নিউইয়র্কবাসি আমার খালা/খালু যখন দেশে গিয়ে বললেন, আমি চাইলে প্রথম কিছুদিন উনাদের বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতে পারি, তখন আমার আনন্দ দেখে কে। উনারাই আমার কলেজ অ্যাডমিশনের সব বন্দোবস্ত করে দিলেন। যথারীতি পরের বছরের ফল সিজনে আমি সাত সমুদ্র তের নদীর ওপার থেকে এসে হাজির হলাম নিউইয়র্কে, উচ্চশিক্ষা গ্রহনের উদ্দেশ্যে।
নিউইয়র্ক দিয়েই আমার প্রথম আমেরিকাকে চেনা। যদিও দেশে বসে টেলিভিশনে দেখা আমেরিকা আর নিউইয়র্কের মাটিতে দেখা আমেরিকার মধ্যে ছিলো আকাশ পাতাল তফাত, তবুও প্রচন্ড হোমসিক থাকা অবস্থায় একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম। আমেরিকা দরাজ দিলে, উদার হস্তে সব অন্যদেশিদেরই নিজের মধ্যে গ্রহন করে। আর তাইতো নিউইয়র্ককে বলা হতো ইমিগ্র্যান্ট বা অভিবাসীদের এক বিশাল মেল্টিং পট। এই মেল্টিং পটে আমি এগারো বছর কাটিয়েছি। লেখাপড়ার পাশাপাশি এ দেশের ভাষা, সংস্কৃতি, আচার ব্যবস্থা, নিয়মনীতি শিখেছি। দৈনন্দিন জীবনে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও দিনের শেষে শান্তিতে ঘুমিয়েছি। স্বপ্ন পূরণের আনন্দ নিয়ে জীবনের সামনের দিকে এগিয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, জীবন ও জীবিকার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইমিগ্র্যান্টদের নিয়ে তৈরী আমেরিকান সমাজের মেল্টিং পটটি, আজ টগবগ করে ফুটা বয়লিং পটে পরিণত হয়েছে।
আগামি ৪ জুলাই ২০২৬, আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিন পালন করা হবে। অর্থাৎ ২৫০ বছর আগে ১৭৭৬ সালে প্রথম এই দেশটির যাত্রা শুরু, ডেক্লারেন্স অফ ইন্ডিপেন্ডেন্স এ স্বাক্ষরের মাধ্যমে। স্বাভাবিক ভাবেই এ বছরটি তাই যথেষ্ট গর্ব ও জাঁকজমকের সাথে পালন করা উচিত। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই আজ মিশ্র অনুভূতির শিকার। অতি সম্প্রতি করা একটি জরীপে জানা যায়, গোটা জনসংখ্যার অর্ধেকের চাইতেও কম মানুষের এই জন্মবার্ষিকি পালনের ব্যাপারে কোনো আনন্দ বা উৎসাহ উদ্দীপনা আছে। জরীপের মতে, প্রতি দশজন আমেরিকানের মধ্যে শুধুমাত্র তিনজন জন্মদিনের ব্যাপারে আনন্দ প্রকাশ করেছে। আরো একটি জরিপে জানা গেছে, রিপাবলিকানরা মনে করে আমেরিকা গত ২৫০ বছরে তাদের সাফল্য এবং অগ্রগতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে। অন্যদিকে বেশির ভাগ ডেমোক্র্যাট ও অল্পবয়স্ক তরুণ প্রজন্মের মতে, এটি সম্পুর্ণ বিপরীত চিত্র। আমেরিকান হিসেবে সারা পৃথিবীর সামনে তারা লজ্জিত।
আমেরিকানরা বরাবরই তাদের নিজস্ব মতামতে বিশ্বাসী। বাক স্বাধীনতা এখানে খুব বড় একটি বিষয় যা প্রতিনিয়ত প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে। নিজের অধিকারের কথা প্রকাশ করতে গিয়ে মহান আমেরিকানবাসীরা আজ প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে বিভক্ত। ধর্ম, সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা, রাজনীতি, স্বাস্থ্যবিধি, পরিবেশজ্ঞ্যান, আবহাওয়া, বিনোদন, সর্বক্ষেত্রে আজ তারা বিভাজিত। প্রতিদিন তারা নিজেদেরকে কোনো একটি নামে, কোনো একটি দলে তালিকাভুক্ত করছে। চালিয়ে যাচ্ছে তর্ক, বিতর্ক, দ্বন্দ্ব, সংঘাত। সবার মনে অশান্তি, অস্থিরতা।
সমগ্র দুনিয়ার মানুষের সামনে বেশির ভাগ আমেরিকান আজ নিজেদের নিয়ে অপমানিত, অসম্মানিত বোধ করে। সাধারণ মানুষের আর বুঝতে বাকি নেই যে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকান রাজনীতি, পররাষ্ট্র নীতি, এবং তাদের শক্তি প্রদর্শন যথেষ্ট ভাবে আলোচিত, বিতর্কিত এবং অসমাদৃত। মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষেরা তাদের অর্থনৈতিক মন্দা কাটাতে এবং দৈনন্দিন জীবন পার করতে এতোটাই হিমশিম খাচ্ছে যে আমেরিকায় তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে তারা সন্দিহান। প্রতিটা স্টেটে বসবাসকারী অভিবাসিরা ভীত, চিন্তিত। কেউ কেউ আতংকে দিন কাটায় যে এই বুঝি তাদের ধরে নিয়ে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিবে। প্রথম জেনেরেশন ইমিগ্র্যান্ট বাবামা চিন্তায় অস্থির, তাদের ছেলেমেয়ে এই দেশের মাটিতে জন্ম নিলেও কি ধরনের ভবিষ্যত তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
বৈষম্যবাদ, বর্ণবাদ, বিভাজন, মেরুকরণ, মিথ্যা প্রচারণা, আক্রমণাত্মক আচরণ, নারী অসম্মান, নিম্নবিত্ত শ্রেণীর প্রতি অবজ্ঞা, অন্য জাতির প্রতি অশ্রদ্ধা, এবং আরো আরো অনেক গর্হিত ও নিম্নমানের আচরণ ও মানসিকতা আমাদের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রতিনিয়ত দেখিয়ে থাকেন। নিজের দেশবাসির কাছে, বিশ্ব দরবারে। তাতে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ বা অপরাধবোধ নেই। বরং উল্টো তিনি দেশবাসীকে ঘোষণা দিয়েছেন যে উনার অধীনে এখন স্বর্ণ যুগের সূচনা হয়েছে। বর্তমান আমেরিকায় এটাও সম্ভব। যা চোখে দেখি, কানে শুনি, প্রতিনিয়ত অনুভব করি সেটা বাস্তব নয়। বরং প্রেসিডেন্ট যেটা বলছেন সেটাই সত্যি। পুরো দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা উনাকেই পছন্দ করে এনেছে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য। আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্যি যে তাদের মধ্যে অনেক ইমিগ্র্যান্ট পপুলেশনও ছিলো।
আমার বরাবরই মনে হতো যে আমেরিকান জাতি বিরাট একটা বাবেল বা গন্ডির মধ্যে বাস করে। এই বাবেল এর বাইরে, সারা দুনিয়াতে কি হচ্ছে এই নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথা ব্যাথা নেই। পৃথিবীর মানুষের দুঃখ, কষ্ট, সমস্যা, অন্যায়, অবিচার কোনো কিছুতেই তাদের কোনো সহানুভূতি হয়না, দুঃখ প্রকাশ হয়না। হতে পারে, অন্য কোনো দেশের কারনে তাদের নিজেদের জীবনযাত্রা, নিজেদের আর্থসামাজিক অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনা। তাই তাদের বাবেলটা অক্ষতই থাকে। দুনিয়ার সবথেকে শক্তিশালী আর বিত্তশালী দেশের নাগরিক হিসাবে তারা বাস করে চলে, গর্ব আর দম্ভকে সাথী করে।
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অন্য কথা বলে। খামোখা যুদ্ধে জড়ানো, তেল সংকট, দ্রব্যমূল্যের উর্ধমুখি গতি, চাকরির অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্য সুবিধার অবনতি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বাজেট কাট, ইত্যাদি বহুবিধ ঘটে চলা বিষয় আমেরিকানদের নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। তারা একটু নড়েচড়ে বসেছে, বাবেলের বাইরে দেখতে শিখেছে। আমেরিকার বাইরে ঘটিত কিছু অপ্রত্যাশিত ঘটনা, কোন অন্যায় সিদ্ধান্ত, কোনো অমূলক নীতি, আমেরিকার মাটিতেও জনজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে, এইটা তারা বুঝতে শিখেছে। সেটাই বা কম কি। ২৫০ বছরের বার্ষিকী উদযাপনের এটি একটি বিরাট পাওয়া। যত যাই হোক, নিজেদের ভালো নিজেদেরই বুঝতে হবে। বুঝতে হবে, চকচক করলেই তামা বা পিতল সোনা হয়ে যায়না।
আমেরিকার মাটিতে যখন দ্বিতীয় জীবন শুরু করেছি, ঘরসংসার স্থাপন করেছি, সন্তান বড় করেছি, তখন আর জায়গা বদলের কোনো ইচ্ছা বা উপায় নেই। এই মাটিতেই আমার জীবনের ইতি ঘটবে। তাই মনে মনে আমার একটাই কাম্য - কোন ধরনের নেতা বা সরকার নির্বাচন করলে আমেরিকার আবার সুদিন ফিরে আসবে, সুনাম হবে, এই শুভবুদ্ধির উদয় সবার মাথায় হোক। কোন ধরনের আমেরিকায় আমরা আমাদের উত্তরসূরিদের রেখে যেতে চাই, সেটা একমাত্র আমরাই নির্ধারন করতে পারি। চাইলে আমরাই সেই গ্রেট আমেরিকান ড্রিম আবার ফেরত আনতে পারি।আমেরিকার সাফল্য কামনা করি। সবাই ভালো থাকবেন।

Comments
Post a Comment