'মা' ভুমিকায়

“ঐ গল্পটা আবার বল,” আমি বড় বড় চোখ করে বলতাম।

মা জিজ্ঞেস করতেন, “কোন গল্পটা?” 
“ঐ যে বেগুন গাছ, দুষ্টু বেড়াল আর টুনটুনির গল্পটা।” 
মা বলতেন, “ওটা তো সেদিনই বললাম। এই নিয়েতো অনেকবার শুনেছো গল্পটা। ঐটাই বলব?”
আমি মহা উৎসাহে বলতাম, “হ্যাঁ, ঐটাই।”

সারা দিনের কাজের শেষে, অঢেল ক্লান্তি আর অবসাদের চাদর সরিয়ে মা বলতে শুরু করতেন আমার প্রিয় গল্পটা - বেগুন গাছ, দুষ্টু বেড়াল আর টুনটুনির গল্প। মা'র কোলে ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত, আমার সমস্ত ইচ্ছাশক্তি দিয়ে প্রাণপণে খোলা রাখতাম চোখ দুটোকে। সীমাহীন আগ্রহ আর অপার আনন্দকে সাথী করে মা'র মুখ থেকে বারবার শুনতাম গল্পটা। বন্দী হতাম গল্প শোনার মায়াজালে।

---------------------------------------------------------------------------------------------------------

এক গৃহস্ত বাড়ীতে ছিল এক মোটা তাজা বেড়াল। বাড়ির পাশে একটি বেগুন গাছে এক টুনটুনি পাখি তার ছোট ছোট তিনটে ছানা নিয়ে বাসা করেছিলো। প্রতিদিন টুনটুনি পাখি বেরিয়ে যেত খাবারের খোঁজে, ছানা গুলোকে বাসায় রেখে। ছানারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো কখন মা পাখি বাড়ি ফিরবে। দিনের শেষে মা পাখি খাবার নিয়ে ফিরত আর ছানাগুলোর সাথে মনের আনন্দে খেত।
একদিন সেই দুষ্টু বেড়ালের চোখ পড়ল ছানা তিনটের উপর। বেড়ালের খুব লোভ হোল ওগুলোকে খাওয়ার। বেড়াল প্রতিদিন এসে ঘুরঘুর করতে লাগলো বেগুন গাছটার চারিদিকে। সুযোগ খুঁজতে লাগলো কখন ছানাগুলোকে খাওয়া যায়। 
টুনটুনি পাখি দুষ্টু বেড়ালের সেই বদ মতলব টের পেয়ে গেলো। সে যখন প্রতিদিন খাবার এনে তার বাচ্চা গুলোর মুখে ধরত, তখন এ ডাল থেকে ও ডালে, একটু একটু করে উঁচুতে উঠতে থাকতো যাতে বাচ্চাগুলো একটু করে ওড়া শেখে। এমন করে বেশ ক'দিন গড়িয়ে গেলো।

একদিন বেড়াল ভাবল, আর দেরী নয়। আজি সে টুনটুনির বাচ্চাগুলোকে খাবে। সে বেগুন গাছের চারিদিকে জোরে জোরে ঘুরতে লাগলো আর লাফ দেবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলো। 
ভয় পেয়ে টুনটুনি তার বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করল, বাছারা তোমরা কি উড়তে পাড়বে? বাছারা বলল, হ্যাঁ মা, আমরা উড়তে পারবো। মা বলল, তবে আমাকে দেখাওতো কেমন উড়তে পারো। ঐ দূরে তাল গাছটায় গিয়ে বসো। বাছারা তাদের ছোট্ট দুটি পাখা মেলে উড়াল দিল আর তাল গাছটার উপর গিয়ে বসলো। 

ঠিক সেই মুহূর্তে বেড়াল দিল এক লাফ, একেবারে বেগুন গাছের ডালে। শূন্য বাসা, মাও নেই, বাছারাও নেই। বেগুন গাছের কাঁটায় বেড়াল হলো রক্তাত্ত ও ক্ষতবিক্ষত। তার মনের সাধ আর মিটল না। 

------------------------------------------------------------------------------------------------------

আমার বয়স তখন পাঁচ কি ছয়। প্রতিবারই যখন গল্পটা শুনতাম, মনের ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করতাম শেষটা শোনার জন্য। মা পাখী তার সাহস আর বুদ্ধি দিয়ে দুষ্টু বেড়ালের গ্রাস থেকে তার বাচ্চাগুলোকে বাচাতো আর বেড়াল পেতো তার প্রাপ্য শাস্তি। যতবারই শুনতাম, ঐ গল্পের সমাপ্তিটা আমার সহজ, সরল শিশুমনে যেন এনে দিতো এক অপারগ শান্তি ও নিরাপত্তার আশ্বাস।

মানুষ এই পৃথিবীতে জন্মিয়ে প্রথম যে মানুষটির সান্নিধ্য লাভ করে সেই মানুষটি তার মা। একটি ছোট্ট শব্দ 'মা'। এরই মাঝে লুকিয়ে আছে জাগতিক মায়া, মমতা, স্নেহ, ভালোবাসা আর আদর ভরা শাসনের মধুর সুধা। দুনিয়ায় মায়ের চাইতে বড় আর কেউ নেই।জীবনের নানান দুঃখ, কষ্ট, হতাশা, ব্যর্থতার সময়ে মায়ের কথাই সবার মনে পড়ে। সন্তানের কাছে মায়ের কোল সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। সন্তান যত বড় হোক না কেনো, মায়ের চোখে সেই শিশুই থাকে। আবার জীবনের সকল হাসিকান্না, আনন্দ, বেদনার মাঝে মা তার সন্তানকেই খুঁজে ফিরে। সন্তানের জন্যে মায়ের আবেগ অনন্ত কালের।

খুব ছোট বয়সে আমি আমার বাবাকে হারাই। যে বয়সে মেয়েরা একটু একটু করে বাবাকে চিনতে শেখে আর মেয়ের সাথে বাবার বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, ঠিক সেই বয়সে। বাবাকে হারিয়ে আমি সব সময় খুব মন খারাপ করে থাকতাম। মা আমার মন ভোলানোর জন্য আমাকে খুশী করতে, ছোটবেলায় বিরাট বড় করে আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠান করেছিলেন।আমার তখন ছয় কি সাত বছর বয়স। উফ, সে যে কি আনন্দ আমার। কেকটা কেমন হবে, আমার জন্য কেমন নতুন জামা বানানো হবে, কোন কোন অতিথি আসবে, কত রঙের বেলুন লাগানো হবে, কি কি উপহার পাবো, এরকম অনেক কিছু ভাবনা নিয়ে বহুদিন ধরে চলেছিল আমার জল্পনাকল্পনা। 

অবশেষে সেই বিশেষ দিনটি এসেছিল। সারা দুনিয়ার যতো আনন্দ, যতো ভালোলাগা, যতো হৈচৈ, যতো উৎসব সব যেন আমাকে ঘিরেই চলছিল। মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে কেক কাটার আগে আমি অপলক দৃষ্টিতে, মুগ্ধ নয়নে শুধু কেকটার দিকে তাকিয়েই ছিলাম। ভয় হচ্ছিল, কেক কাটলেই যদি জন্মদিন শেষ হয়ে যায়। শৈশবের রঙিন স্মৃতি গুলির মধ্যে এটি আমার অন্যতম একটি স্মরণীয় স্মৃতি।

বড় হয়ে গেলে জন্মদিন উপভোগের আনন্দটা পালটে যায়। কেক কাটায় তত আনন্দ না হলেও সবার কাছ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা মেসেজ পেতে ভালো লাগে। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বাস করা পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের কাছ থেকে জন্মদিন বার্তা এলে মনের মধ্যে এক ধরনের ভালো লাগা জন্ম দেয়। তবে একটি কথা আমার সব সময় মনে হয়। সবার পাঠানো এই শুভেচ্ছা বার্তাগুলো শুধু আমার একার নয়, বরং আমার মায়েরও। যিনি আমাকে কষ্ট করে জন্ম দিয়েছেন, পরম মমতায় বড় করেছেন। যার জন্য এই পৃথিবীর আলো প্রথম দেখেছি। এ দিনটি শুধু আমার জন্মের দিন নয়, আমার মায়ের কষ্ট আর আত্মত্যাগের দিনও। তাই এ দিনটির কৃতিত্ব শুধুমাত্র মায়ের। বহু বছর পরে, আমি নিজে এখন মা'এর ভূমিকায়। জানিনা, আমার ছেলেরা আরো বড় হয়ে তাদের জন্মদিনে আমার জন্য এরকম করে ভাববে কিনা।

বিদেশের মাটিতে আমরা যারা প্রবাস জীবন পার করছি এবং সন্তান  বড় করছি, আমরা আমাদের মা ভূমিকা পালন করছি ঠিকই কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত অনুভব করি কিছু পার্থক্য। মা-সন্তানের সমীকরণ এর মধ্যে কিছু তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। এদের মধ্যে ভাব প্রকাশের ভঙ্গিটা ভিন্ন। আমি মা হয়ে আমার সন্তানদের আমার সবটুকু দেয়ার চেষ্টা করি। যেমনটি দিয়েছেন আমার মা'ও।  আমাদের জেনেরেশনের সন্তানেরা তাদের বাবামার জন্য যেভাবে ফিল করে বা তাদের জন্য সেবা করতে এগিয়ে যায়, এই জেনেরেশনের ছেলেমেয়েরা তেমন ভাবে নৈকট্য প্রকাশ করেনা। যার ফলে সঠিক ভাবে সম্পর্কের গভীরতাটা বুঝতে সময় লাগে। কাজেই প্রতি বছর মা দিবসে ওদের সুযোগ মেলে, মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের।  

আমেরিকায় প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশাল করে মা’ দিবস পালন করা হয়। এই একটি দিনে, সবচেয়ে ব্যস্ত মানুষটিও কাজ ফেলে তার মা’র কথা স্মরণ করে। ফুল, কার্ড, কেক, চকোলেট, উপহার সামগ্রী, অথবা নিজেই হাজির হয়ে মা’কে তার পছন্দের জায়গায় খেতে নেয়া বা পছন্দের জিনিসটা কিনে দেয়া, এগুলো এই দেশের খুব প্রচলিত নিয়ম। মা'রা তাদের মনপ্রাণ উজার করে এই দিনে তাদের প্রতি দেয়া বিশেষ মনোযোগ উপভোগ করেন। 

শুনেছি আমাদের দেশেও মা’ দিবস এর দিনটি বিশেষ তাৎপর্য পায়। ছেলেমেয়েরা তাদের মা'কে সম্মান ও ভালোবাসায় আপ্লূত করে। মা’কে নিয়ে পারিবারিক আনন্দ, উৎসব এর মধ্য দিয়ে ঘটা করে দিনটি পালন করা হয়। স্কুল, কলেজে কবিতা আবৃত্তি, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা হয়। মানুষের জীবনে তাদের মায়ের অপরিসীম অবদানের কথা গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করা হয়।

অনেকে মা দিবস পালনের ক্ষেত্রে বিশাল আপত্তি তুলে। কেন ঘটা করে শুধু একটি দিনে মা’দের কথা স্মরণ করা হবে যেখানে প্রতিদিনই মা’দের নিয়ে ভাবা উচিত, তাদের প্রতি মনোযোগী হওয়া উচিত, এমন কিছু যুক্তির পক্ষে তারা কথা বলে। তাদের কথা অবশ্যই গুরুত্ব বহন করে। তবে আমার ভাবনাটা একটু অন্য রকম।

আমাদের পৃথিবীটা খুব জোরে দৌড়ুচ্ছে। এই দৌড়ানো প্রতিযোগিতায় পৃথিবীর মানুষগুলো সবাই সামিল। সবাই খুব ব্যস্ত, নিজের চিন্তায় মগ্ন। এই ব্যস্ত সময়ে প্রতিদিন নিজেকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে নিয়ে ভাবার সময় খুব কম মানুষের হয়। তা সে হোক মাবাবা, ভাইবোন, স্বামীস্ত্রী বা বিশেষ কেউ। 

তাই প্রতি বছর একটি বিশেষ দিন নির্ধারন করে যদি আমরা আমাদের মা’দের কথা স্মরণ করি, তাদের আনন্দ দেই, অথবা নিজেরা মা হয়ে আনন্দ পাই, তাতে ক্ষতি কি? এই মনোযোগটুকু আমরা নেবো না কেন? মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হতে কার না ভালো লাগে। হয়তো মা হিসেবে সন্তানের প্রতি আমাদের অবদান অনেক বেশী, এবং সেই তুলনায় এটা কিছুই না। কিন্তু চাওয়া পাওয়ার হিসাব কি সবসময় সমান হয়?

প্রতিটি নারীর মধ্যে একটি ‘মা’ সত্তা বিরাজমান। সৃষ্টিকর্তা নারীদের এভাবেই তৈরি করেছেন। এমনকি আমাদের প্রিয় ধরিত্রীকেও সুজলা, সুফলা, আবাদি নারী(মা) হিসেবে কল্পনা করা হয়। মা খুব ছোট্ট একটা শব্দ। কিন্তু এর গভীরতা, এর বিশালতা, এর প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অপরিসীম। তাই মায়ের প্রতি আমাদের ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা হওয়া উচিত অসীম থেকে অসীমতর। সন্তান জন্মের প্রসব বেদনা একমাত্র তিনিই জানেন। একবার মা হওয়ার সম্মান যিনি পেয়েছেন সেই অবস্থান এর মাহাত্য শুধু তিনিই জানেন। মা হওয়া এমনই একটা ব্যাপার। এই ব্যাপারটা নারী জাতির সবার ভাগ্যে হয়না। অনেকে চেষ্টা করেও মা হতে পারেনা। সেই কষ্টের অনুভূতিটা শুধু তারাই জানে।   

পেছনে ফেলে আসা দিনগুলোর মধুর স্মৃতি প্রায়ই চোখে ভাসে। কানে বাজে আমার মা'র স্নেহভরা, সুমধুর কণ্ঠস্বর, বাছারা তোমরা কি উড়তে পারবে?...

আমি উড়তে শিখেছি, মা আমাকে শিখিয়েছেন। নিজ জীবনে চলার মত শিক্ষা, সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। মা এর নীড় ছেড়ে উড়োজাহাজে করে উড়ে আমি অনেক দূর চলে এসেছি। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে অন্য একটি দেশে। এখন মা'র কোলে বসে গল্প শুনতে খুব ইচ্ছে করে। তাই প্রতি মা দিবসে মা’কে স্মরণ করি, ফোন করি। ফোনের ওপাশ থেকে মা এর স্নেহমাখা গলাটা শুনতে ইচ্ছে করে, "ভয় নেই, তুমি পারবে।" 

যারা মা হতে পেরেছেন, যারা মা হতে যাচ্ছেন, আর কোনো কারনে যারা মা হতে পারেননি - এই মা দিবসে কাছেদূরে সকলের প্রতি আমার অফুরান ভালোবাসা ও শুভকামনা।

Comments