রোদেলার বৈশাখ
রোদেলা অনিচ্ছা সত্ত্বেও আলস্য ভরে মুঠো ফোনটা হাতে নিলো। শুক্রবার সকালে তার বিছানা থেকে উঠতে মন চায়না। মা এসে একবার ডেকে গিয়েছে। বুয়া এসে বিছানার পাশে চা দিয়ে গিয়েছে। সেটাও খাওয়া শেষ। তবুও রোদেলার আলস্য কাটছে না। সে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে মুঠো ফোনের সবুজ বাটনে চাপ দিলো, 'হ্যালো'
'কিরে, এখনো উঠিস নাই? ছুটির দিন সকালে কি বিউটি ন্যাপ নেয়া হচ্ছে? ...ওপাশ থেকে খালামনির আদুরে কণ্ঠস্বর।
'এতো সকালে আমার প্রিয় খালামনি কেনো আমাকে খুঁজছে? আজ কি কোনো শপিং প্ল্যান আছে? বলতে বলতে রোদেলা একটু নড়েচড়ে আধশোয়া হয়ে বসলো।
'না শপিং নয়, তবে তার থেকেও রোমাঞ্চকর, বলতে পারিস টুরিং। ট্যুরগাইড হতে হবে তোকে।"
'আমি গাইড হয়ে তোমাকে কি দেখাবো? পুরো ঢাকা শহরতো তোমার নখদর্পনে...বিশেষ করে শপিং মল গুলো।' বলেই রোদেলা খিল খিল করে হাসতে লাগলো।
'এই জন্যইতো তুই আমার সবচাইতে প্রিয় ভাগ্নি, এক ডজন ভাগ্না ভাগ্নির মধ্যে। তোর মধ্যে একটা সরলতা আছে এবং সেটা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সাথে। আর আমি এটাও জানি, তোর কাছে কিছু চাইলে তুই না করতে পারবিনা।'
'উফ্, সাতসকালে এতো ভনিতা না করে তাড়াতাড়ি বলে ফেলো কাকে শহর ভ্রমণে নিতে হবে?'
খালামনি একটু থেমে বলতে শুরু করলো। 'আমার মেজো ভাশুর এর ছেলে এসেছে আমেরিকা থেকে। খুব শর্ট ভিসিট বলতে পারিস। এই একটু ওর বাবামার দেশটাকে দেখা, আমাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা করা, শহরটা ঘুরে দেখা, এই আরকি। আমি ভাবলাম, সামনে মঙ্গলবারে আমাদের পহেলা বৈশাখ। আমাদের বর্ষবরণ উদযাপন দেখলে ওর খুব ভালো লাগবে, কৃষ্টি সংস্কৃতিও অনেক জানতে পারবে। তুই কি বলিস?'
'খুবই দারুন আইডিয়া। তা তোমার আমেরিকান ভাতিজার নাম কি? সে কি বাংলা বোঝে?' রোদেলার ঝটপট প্রশ্ন।
'ওর নাম অর্ক। ও সব বাংলা বোঝে। কারণ ওর বাবামা বাড়িতে সবসময় বাংলা বলে। তবে ও নিজে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতে পারে। তাও আবার আমেরিকান অ্যাকসেন্ট দিয়ে বলে।' এবার খালা, ভাগ্নি দুজনেই হাসতে শুরু করলো।
রোদেলা হাসি থামিয়ে বলল, 'দাড়াও, তোমার আমেরিকান বাবুকে আমি পান্তা ভাত দিয়ে কাচামরিচ খাইয়ে দিবো। তখন দেখো কি হয়।'
'কি দস্যি মেয়েরে বাবা। দেখিস, বেশি ভয় পাইয়ে দিলে ও আর ভুলেও কোনোদিন দেশে বেড়াতে আসবেনা।'
মঙ্গলবার সকালে রোদেলা খুব সুন্দর একটা শাড়ি পড়লো। সাদা জমিনে গাড়ো লাল চওড়া পাড়ের গাদোয়াল শাড়ি। চুলের খোঁপায় দিলো বেলি ফুলের মালা। কপালে লাল টিপ, হাত ভর্তি সাদালাল রিনিঝিনি চুড়ি। দুই পায়ে রুপার মল। এই মল জোড়া ওকে খালামনি দিয়েছে ওর ষোলোতম জন্মবার্ষিকীতে।
রোদেলার বান্ধবিরা বলে, রোদেলার হাসি রোদেলার থেকেও সুন্দর। ও যখন হাসে, রোদের মতই ওর চারিপাশ ঝলমল করে। সেই হাসির কিরণ ছড়িয়ে পড়ে সবার উপর। খালামনির ধারণা, রোদেলাকে পছন্দ করার আগে ওর হাসির প্রেমে পড়বে যে কোনো ছেলে।
রোদেলা যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স করছে, তবুও তার চারুকলা অনুষদে অনেক জানাশোনা বন্ধুবান্ধব আছে। তাদের সাথেই ও ঠিক করে রেখেছিল ক'টার সময় মিলিত হবে। কারণ অর্ককে প্রথম যে ব্যাপারটা সে দেখাতে চেয়েছিল সেটা ছিলো পহেলা বৈশাখের বর্ণিল শোভাযাত্রা। চারুকলার ঐ বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় অংশ নেয় হাজার হাজার মানুষ। এই শোভাযাত্রায় বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী পুতুল, মুখোশ, বিভিন্ন প্রাণির প্রতিকৃতি, ফেস্টুন ও ব্যানার প্রদর্শিত হয়।
অর্ক একটি উবারে করে আগের থেকে জানিয়ে রাখা স্থানে এসে অপেক্ষা করছিল। অর্কর জন্ম আমেরিকায়। খুব ছোটবেলায় সে একবার বাবামার সাথে দেশে এসেছিলো। সেটার কথা অবশ্য ওর কিছুই মনে নাই। ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স শেষ করে ফুল টাইম কাজে ঢোকার আগে সে একটু ছুটি নিয়ে দেশে বেড়াতে এসেছে। বাবামার কাছ থেকে সে যেমনটা শুনেছে, তার থেকেও ওর বেশি ভালো লাগছে ঢাকা শহরটাকে।
নানান রঙে নানান সাজে সজ্জিত একদল ছেলেমেয়ের সাথে হৈ চৈ করতে করতে রোদেলা এসে ঢুকল চারুকলা প্রাঙ্গণে। দূর থেকে অর্কর দৃষ্টি রোদেলার উপর পড়ে থমকে গেলো। বাঙ্গালিয়ানার কি এক অদ্ভূত সুন্দর মিশ্রণ ওর চেহারায়, সাজসজ্জায়, পোশাকে, ভঙ্গিতে। ওর নামটাও কি অসম্ভব সুন্দর, ভাবলো অর্ক। ভাবতে ভাবতে রোদেলার সামনে এসে দাঁড়ালো সে।
'আমি অর্ক। চাচীর মুখে আপনার কথা অনেক শুনেছি।' ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় অর্কের প্রথম সম্ভাষণ।
'আমি রোদেলা। খালামনির বিশেষ অনুরোধে আপনার ট্যুরগাইড হতে সম্মত হয়েছি।' একটু থেমে আবার বলল রোদেলা 'তা অর্ক সাহেব, আপনার পাঞ্জাবিটা কি নিজের নাকি ধার করা?' বলেই হাসিতে ভেঙ্গে পড়লো সে।
কি অপূর্ব সুন্দর হাসি মেয়েটার। মুহুর্তেই মন ভালো করে দেয়। রোদের মতই ঝকঝকে রোদেলার হাসি। আর কি মায়াভরা চাহনী তার। অনেকগুলো ভাবনা একসাথে অর্কের মনে দোলা দিয়ে গেলো।
রোদেলার বান্ধবী মিতালি ওর কানে ফিসফিস করে বলল, 'এই হ্যান্ডসাম বিদেশী বাবু কে গো? কি দারুন কিউট করে বাংলা বলে।'
'খালামনির অর্ডার ওকে ট্যুর দিতে হবে। তুই বুঝবি না।' ফিসফিস করে উত্তর দিলো রোদেলা।
মিতালি অবশ্য ঠিকই বলেছে, রোদেলা ভাবল। মেদহীন সুঠাম দেহ, প্রশস্থ কাঁধ, দেখে মনে হয় ছয় ফুট লম্বা হবে অথচ একটুও কুঁজো নয়। পাঞ্জাবিতে ওকে দারুণ মানিয়েছে। কি অমায়িক শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলে অথচ ভরাট গলার আওয়াজ। কোনো ঠাটবাট নেই, গাম্ভীর্য নেই, অহংকার নেই। অর্ককে দেখলে যে কোনো মেয়েরই পছন্দ হবে। খালি একটু ঘষামাজা করে বাঙালি হওয়ার ট্রেনিং দিতে হবে। মনে মনে হাসল রোদেলা।
অর্ককে সাথে নিয়ে ছেলেমেয়েগুলো একের পর এক রমনার বটমূল, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টি এস সি, শিল্পকলা একাডেমি, ধানমন্ডি লেক, হাতির ঝিলে, বাংলা নববর্ষের মনোরম সাংস্কৃতিক উদযাপন দেখলো। উপভোগ করলো নাচ, গান, মঞ্চনাটক, পুতুলনাচ। মেলায় গিয়ে হরেক রকম মজাদার বাঙালি খাবার পান্তাইলিশ, ভর্তা, ভাজি, খিচুরি মাংস, লুচি, আলুর দম, পিঠা, মিষ্টি খেলো। সবার সাথে পাল্লা দিয়ে ঝাল খেতে গিয়ে অর্কের একেবারে নাজেহাল অবস্থা হলো। তার চোখ, কান, মুখ লাল হয়ে যেতে দেখে রোদেলা মহাচিন্তায় পড়লো যে খালামনি তাকে আস্ত রাখবে না।
সারা দিন খুব আনন্দে কাটালো রোদেলার। ফুরফুরে মেজাজে সে বাড়ি ফিরে এলো। থেকে থেকে তার মনে হতে লাগলো, এই বছরের বৈশাখটা একদম অন্যরকম। কই, এর আগে তো এমন মনে হয়নি।
এর পরের এক সপ্তাহ রোদেলা ক্লাসের পরীক্ষা নিয়ে খুব ব্যস্ত সময় কাটালো। তখন আর কোনো কিছু চিন্তা করার অবকাশ ছিলোনা। পরীক্ষা শেষে এক ছুটির দিনে রোদেলা ফোন করলো খালামনিকে।
'কিরে তুই ফ্রি হয়েছিস? পরীক্ষা শেষ হয়েছে?' খালামনির প্রশ্ন।
'হ্যাঁ হয়েছেতো। তুমি কেমন আছো?'
'আমি তো ভালো। এদিকে গত সপ্তাহে আমার ভাশুরের শরীর হঠাত করে খারাপ হওয়ার খবর আসায়, অর্ক তাড়াহুড়া করে টিকেট বদলে আমেরিকায় ফেরত চলে গিয়েছে। বাব্বা, যা ভয় পেয়েছিলাম। এখন অবশ্য বিপদ কেটেছে। কিছু দিনের মধ্যেই ভাইজানকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দিবে।'
'ও তাই?' গম্ভীর হয়ে বলল রোদেলা।
'অর্ক অবশ্য যাওয়ার আগে তোর সাথে দেখা করতে চেয়েছিলো। আমি ফোনও দিয়েছিলাম। আপা বলল, তুই পরীক্ষা নিয়ে খুব ব্যস্ত। তাই আর তোকে বিরক্ত করিনি।'
ফোনের এপাশ থেকে রোদেলা হঠাত চুপ করে গেলো। 'রাখি খালামনি, পরে কথা বলবো। আমার খুব মাথা ধরেছে।'
সময়ের পরিক্রমায় একে একে আরো দু'বছর কেটে গেলো। রোদেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স গ্র্যাজুয়েশন শেষ করতেই ওর বাবামা বিয়ের সম্বন্ধ দেখতে শুরু করলো। দেশের ভেতর অনেকগুলো ভালো ছেলের প্রস্তাব আসলেও শেষমেষ রোদেলা পছন্দ করলো আমেরিকায় থাকা একজন ডাক্তার পাত্রকে। মা এতে প্রথমে আপত্তি করেছিলো যে ওদের একমাত্র মেয়ে কত দূরে চলে যাবে। কিন্তু রোদেলা নাছোড়বান্দা, সে ঐ আমেরিকায় থাকা ছেলেকেই বিয়ে করবে।
যথারীতি বিয়ের দিন মেয়ে বিদায়ের সময় এলো। রোদেলাকে বিদায় দিতে এসে সবাই কাঁদছে। খালামনি কাঁদতে কাঁদতে একসময় রোদেলাকে ধরে গলা নামিয়ে বলল, 'তুই তো জানিস তুই আমার খুব প্রিয়। তোর খালুর পরিবারও তোকে অনেক পছন্দ করে। ওরা চেয়েছিলো, অর্কের জন্য তোকে বউ করে ঘরে আনতে। অর্ক দেশেও এসেছিলো তোকে দেখতে। ওর ভাবসাব দেখে আমার মনে হয়েছিলো ওর তোকে পছন্দ হয়েছে। আমি আপা ও দুলাভাইএর কাছে একসময় কথাটা পেড়েছিলাম। উনারা এক কথায় না করে দিলেন। পরিবারের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে উনারা বিয়ে দিবেন না।'
রোদেলা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে খালামনির দিকে তাকিয়ে রইলো। বিয়ের কনে সাজে তাকে অপরুপ সুন্দর লাগছে কিন্তু তার দুই চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।
রোদেলার প্রবাস জীবন শুরু হলো নতুন এক অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে। একটা নতুন মানুষকে স্বামী হিসেবে পুরাপুরি ভাবে চেনা, উপরোন্তু নতুন এক জীবনধারার সাথে অভ্যস্ত হওয়া। শুরু থেকেই ঘরকন্না, সংসার, স্বামীসেবা সব কিছুই সে খুব মন দিয়ে করতে থাকলো এবং আস্তে আস্তে আমেরিকান জীবনে অভ্যস্ত হতে থাকলো। তবে আগের থেকে সে অনেক চুপচাপ হয়ে গেলো। হতে পারে বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার মন মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এলো। হতে পারে সে নিজের মধ্যে নিজেকে একপ্রকার গুটিয়ে আনলো।
প্রাণবন্ত, উচ্ছল রোদেলা অনেক ধীরস্থির ও শান্ত চিত্তের হয়ে গেলো। সে এখন আর আগের মত কথায় কথায় হাসিতে লুটিয়ে পড়েনা। কেউ কিছু বললে চটাং চটাং কথার উত্তর দেয়না। অস্থিরতা, অশান্তপনা তার নিত্যদিনের কোনো কিছুতেই সঙ্গী নয়। সে কথা কম বলে এবং খুব শান্ত ভঙ্গীতে আশেপাশের সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে। অথবা হতে পারে, জীবনের অনেক কিছুতেই তার উৎসাহ ও উদ্দীপনার ভাটা পড়েছে।
আমেরিকার ভারজিনিয়া স্টেটের রিচমন্ড শহরের একটা নামকরা হাসপাতালে ওর স্বামী অনন্ত চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। ঐ শহরের একটা ছোট সাবার্ব এলাকায় তাদের দুজনের ছোট্ট সংসার। অনন্ত তার ডাক্তারি পেশার কারনে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকে। তবুও ছুটির দিনটাতে বা যেদিন সে অন কলে থাকেনা সেদিন রোদেলাকে নিয়ে আশে পাশে ঘুরতে যাওয়ার চেষ্টা করে। বিশেষ করে বাঙালি কম্যুনিটিতে কোনো অনুষ্ঠান বা পালাপর্বনে সে রোদেলাকে নিয়ে যেতে চায়।
রোদেলা অবশ্য বেশির ভাগ সময়েই এক ধরনের অনিচ্ছা প্রকাশ করে এবং বলে, কোথায় আমাদের দেশ আর কোথায় তোমাদের আমেরিকা। দেশের আমেজ, দেশের গন্ধ, দেশের স্বাদ কোথাও পাইনা। সব কিছু আলাদা, সব কিছু অন্যরকম।' দেশ অনেক মিস করে রোদেলা।
অনন্তর খুব মায়া হয় রোদেলার জন্য। সে ভাবে, মেয়েটা এই অন্য দেশে, অন্যরকম পরিবেশে মানিয়ে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। এটা কোনো সহজ বিষয় নয়। রোদেলা খুব সুন্দর করে সংসার করছে, খুব ভালো একজন স্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু কেন জানি রোদেলাকে দেখে অনন্তর মনে হয়, ও সব কিছুতে থেকেও, কোনো কিছুতে নেই। কোথায় যেন একটা ছন্দপতন। মাঝে মাঝে অনন্তর মনে হয়, রোদেলা কি এই বিয়েতে খুশি নয়? কিন্তু সে তো নিজেই এই বিয়েতে মত দিয়েছে।
একদিন অনন্ত হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে বলল, 'রোদেলা, সামনে রবিবারে এখানে লোকাল কম্যুনিটি পার্কে বিশাল বড় করে একটা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হবে। আশেপাশের ট্রাইস্টেট এরিয়া থেকে অনেক মানুষ আসবে, প্রচুর লোক সমাগম হবে। তুমি যাবে? ওখানে গেলে তোমার ভালো লাগবে। সারাদিন বাড়িতে একা একা থাকো, তেমন একটা কোথাও যাওনা। জানি, এটা তোমাদের ঢাকা ইউনিভার্সিটির বর্ষবরণের তুলনায় কিছুই না। তবু আমরা প্রবাসিরাও চেষ্টা করি, দূরে বসে দেশীয় সংস্কৃতি পালন করতে।'
রোদেলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, 'যত যাই হোক, আমাদের ঢা বি এর বৈশাখী সেলিব্রেশনকে কেউ টপকাতে পারবেনা। আচ্ছা ভেবে দেখি।'
যথারীতি রবিবার দিন সকালে রোদেলা সাদালাল সূতির একটা শাড়ি বের করে পড়লো, সুন্দর করে সাজলো। অনেক দিন পর সেদিন খালামনির দেয়া মলজোড়া বের করে পড়লো। গাড়িতে ওঠার সময় অনন্ত ওর দিকে সম্মোহনী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, 'রোদেলা, তোমাকে আজকে ভীষণ সুন্দর লাগছে। মনে হয় ঠিক হাই ভোল্টেজ বাল্বের মত তুমি তোমার চারিদিক আজ রাঙ্গা করে দিবে।' শুনে রোদেলা মিষ্টি করে হাসল।
কম্যুনিটি পার্কের বড় উদ্যানে বৈশাখী মেলার বিরাট আয়োজন বসেছে। বিশাল করে সাজানো মঞ্চে চলছে একাধারে গান, নাচ, কবিতা, নাটক, বাচ্চাদের বিভিন্ন রকম প্রতিযোগিতা। চারিদিকে নানা রঙের রঙ্গিন বাঙালি সাজের ছড়াছড়ি। ছবি তোলা, হাসি আড্ডা, মেয়েদের শপিং, খাওয়া দাওয়া। খাবার স্টলগুলোতে অজস্র লোকের উপচানো ভিড়। সবাই দেশীয় পরিবেশে, দেশীয় খাবারের স্বাদ পেতে মুখিয়ে আছে।
অনন্ত বলল, 'আমি আমাদের দুজনার জন্য চা নিয়ে আসি। চা এর লাইন যে লম্বা, আমার সময় লাগবে। রোদেলা তুমি ও দিকটায় গিয়ে কোথাও বসো।'
রোদেলা চটপটির বাটি হাতে মাঠের ধারে একটা পাথরের উপর গিয়ে বসলো। ও চারিদিকে তাকিয়ে আশেপাশের মানুষদের ভিড়, ঠেলাঠেলি দেখছে।হঠাত রোদেলার দৃষ্টি এক জায়গায় গিয়ে স্থির হয়ে গেলো......উজ্জ্বল হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরা ঐ লোকটা তার ভীষণ চেনা। মনের গহীনে যার মুখখানা ধিকিধিকি করে জ্বলছে। সেই অবয়ব, সেই উচ্চতা, সেই দাঁড়িয়ে কথা বলার ভঙ্গি...কি করে ভুলবে সে।
'অর্ক এতোদিন কোথায় ছিলে তুমি? মনে মনে আমি তোমাকে কত খুঁজেছি।' রোদেলার বুকের ভেতরটা উথাল পাথাল করে উঠলো।
সে উঠে গিয়ে অর্ক বরাবর হাঁটা শুরু করলো। অনেক ভিড়ভাট্টা সরিয়ে, অনেক মানুষ হটিয়ে, আস্তে আস্তে সে অর্কর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। অর্ক আপন মনে পাশে দাঁড়ানো একটা ছেলের সাথে কথা বলছিলো। পাশের ছেলেটা প্রথম রোদেলাকে দেখতে পায়। তারপর সে অর্কর দিকে তাকিয়ে রোদেলার দিকে ইশারায় ইঙ্গিত করতেই, অর্ক ঘুরে তাকালো রোদেলার দিকে।মনে মনে একটু ধাক্কা খাওয়ার ভঙ্গীতে অর্কর মুখটা কিঞ্চিত হা হয়ে গেলো। সে চোখে মুখে একরাশ বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলো, 'রোদেলা তুমি? তুমি এখানে কবে এসেছো?' সেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলার দারুণ কিউট সম্ভাষণ।
রোদেলা শান্ত ভঙ্গিতে বলল,'আমি এসেছি বছর খানেক হবে। তুমি কি এখানে কাছাকাছি থাকো?'
রোদেলা অনেক বার ভেবেছে খালামনিকে জিজ্ঞেস করবে কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়নি, অর্ক কোন স্টেটে থাকে। জিজ্ঞেস করতে তার কেমন যেন লজ্জা লেগেছে। কিন্তু এতোদিন সে তাকে খুঁজেছে, মনে মনে পাগলের মত খুঁজেছে।
'আমি মানে, আমি ও আমার স্ত্রী থাকি ক্যালিফোর্নিয়ায়। আমার স্ত্রী এর ফ্যামিলি থাকে ভারজিনিয়ায়। আমরা ওর বাবামার বাসায় বেড়াতে এসেছি সপ্তাহ খানেকের জন্য।' 'তুমি কবে এসেছো স্টেটস এ? হাসব্যান্ড এর সাথে?'
'হ্যাঁ, আমি বিয়ের পরে এসেছি। আমরা এই ভারজিনিয়ায় থাকি।' রোদেলা প্রাণপণে স্থির থাকার চেষ্টা করছে।
'ওহ্ মাই গড। ইটস আ স্মল ওয়ারল্ড।' মাথা নাড়িয়ে বলল অর্ক।
রোদেলা কিছু বলল না। তার মনে পড়ে গেলো সেদিনের কথা।
'আচ্ছা অর্ক, তোমার কি মনে পড়ে ঐ দিনটার কথা? সেই বৈশাখী মেলায়, আমরা যখন নাগরদোলায় চড়েছিলাম? তুমি আমার কাঁধে আলতো করে চাপ দিয়ে বলেছিলে, আমাদের দু'জনার নামের ভেতর একটা অদ্ভুত যোগাযোগ আছে।'
আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আপনি কি অর্ক মানে জানেন?'
তুমি বলেছিলে, 'অর্ক মানে সূর্য, আমার মা আমাকে বলেছে। ওরা আমার জন্মের সময় এই নামটা দিয়েছে। যাতে আমি সূর্যের মতই শক্তিশালী, প্রত্যয়ী, আর কঠিন হতে পারি।'
আমি বলেছিলাম 'আর যোগাযোগটা কিভাবে?'
তুমি বলেছিলে, 'আমরা একে অপরকে ছাড়া অর্থহীন। সূর্য তার শক্তিশালী রশ্মি বিচ্ছুরণ করে বলেই এতো সুন্দর রোদ আমরা পৃথিবীতে পাই। সূর্য আছে বলেই রোদেলা দিনের সার্থকতা।'
আমি বলেছিলাম, 'তাইতো, আমিতো অমন করে ভাবিনি।'
ভাবতে ভাবতে রোদেলার দুই চোখ ফেটে কান্না আসছে। অর্কর হাতটা শক্ত করে ধরে ওর বলতে ইচ্ছে করছে... 'যেখানে কোনো সূর্য নেই, সেখানে কোনো রোদেলাও নেই। সূর্য ছাড়া রোদেলার পৃথিবী অন্ধকার। সবই অন্ধকারে ঢাকা।'

Comments
Post a Comment