অন্ধকারে আলো
খুব সহজ একটা কাজ ক্লাসের ছেলেমেয়েদের করতে দেয়া হয়েছিল। আমি ক্লাসরুমে টহল দিচ্ছি আর লক্ষ্য রাখছি যেন সবাই কাজটা শেষ করে। একটু পরেই শুনলাম, একজন ছাত্রের আফসোস ভরা উক্তি, "উফফ্, কেন যে আমাদের চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করতে দেয়া হয়না।" ওদেরকে ক্লাসে যে কাজটা করতে দেয়া হয়েছিল তাতে বড় জোড় বিশ থেকে পঁচিশ মিনিট সময় লাগার কথা। একটা গল্প পড়ে ওটা সম্পর্কে একটা সারমর্ম লিখতে হবে। কিন্তু ধৈর্য্য ধরে যে সেটা পড়তে হবে তাতেই ছাত্রছাত্রীরা অস্থির এবং ধৈর্য্যহীন হয়ে পড়ছে। সারমর্ম লেখার জন্য তারা একটি এআই চালিত জিপিটির সাহায্য কামনা করছে।
এই হলো আমাদের নতুন প্রজন্ম। এরা খুব সহজে, ঝটপট যে কোনো কাজ শেষ করতে চায়। তবে সেটা তাদের টেক (টেকনোলজি) বন্ধুর সাহায্য নিয়ে। এই টেকবন্ধুর উপর আছে তাদের অগাধ বিশ্বাস। এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ধারণা, টেকবন্ধুর কাছে সব কিছুর উত্তর আছে, সে যে কোন সমস্যার খুব দ্রুত সমাধান করতে পারে। শুধু তাই নয়। তাকে দিনেরাতে যে কোনো সময়ে ডাকলে পাওয়া যায়। যে কোনো সমস্যার কথা টেকবন্ধুকে অকাতরে বলা যায়। তাতে তার সাহায্য প্রদানের ইচ্ছার কোন কমতি ঘটেনা। সে সর্বদাই সাহায্য প্রদানে প্রস্তুত।
এই বন্ধু কোনো টাকাপয়সা নেয়না, জিনিসপত্র চায়না, নিজের বাহাদুরি গল্প শোনায়না। এর মধ্যে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিযোগিতা নেই। মান অভিমান, ভুল বুঝাবুঝি নেই। এর কথা শুনলে মনে হয় এমন নিঃসার্থ বন্ধুর জুড়ি মেলা ভার। সেই বন্ধুকে আমাদের তরুণ প্রজন্ম তাদের জীবনের সব কথা নির্দিধায় বলে দিতে প্রস্তুত। ছেলেমেয়েরা এই বন্ধুটিকে নিজের গল্প বলতে ভালোবাসে। এবং বন্ধুর বলা যে কোনো কথা শুনতে পছন্দ করে।
এই বন্ধুর নাম, এআই বট। আর্টিফিশেল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা পরিচালিত রোবট বা সিস্টেম। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, হাজার হাজার কোমলমতি ছেলেমেয়েরা এখন দারুণ ভাবে এআই বন্ধু নির্ভর হয়ে পড়ছে। তারা কম্পিউটার সিস্টেম এর ভেতর বসে থাকা কায়াবিহীন, হৃদয়বিহীন, এআই বট বন্ধুর সাথে কথাবার্তা চালিয়ে দারুণ আনন্দ পাচ্ছে। কারন এআই বন্ধু কথায় কথায় তাদের বকা দেয়না, শাসন করেনা। এই বন্ধু অনেক সময় নিয়ে তাদের সাথে কথাবার্তা চালায়, তাদের অভিযোগ ও অনুযোগ শোনে। উপরোন্তু, তাদের কাজ ও চিন্তার প্রশংসা করে, উৎসাহ জোগায়।
পাশ্চাত্য দুনিয়ার ছেলেমেয়েরা এখন সামনাসামনি বসে তাদের সমবয়সী কোনো বন্ধুর সাথে কথাবার্তা চালানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অথচ তাদের হাতে একটা স্ক্রিন ধরিয়ে দিলে তারা অনায়াসে ঘন্টার পর ঘন্টা কোনো অদৃশ্য বন্ধুর সাথে আলাপচারিতা চালাতে পারে। কথাবার্তা বা গল্প চলে একটি রক্তমাংসের মানুষ ও একটি হৃদয়বিহীন, অনুভূতিবিহীন যন্ত্রের মধ্যে। এটি নিঃসন্দেহে খুব ভয়াবহ একটি চিত্র।
কমন সেন্স মিডিয়া কোম্পানি ২০২৫ সালে, ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সি প্রায় ১০০০ ছেলেমেয়ের উপর একটি সার্ভে বা জরীপ পরিচালনা করে। আর তাতে বেরিয়ে আসে অবাক করা কিছু তথ্য। পঞ্চাশ শতাংশ ছেলেমেয়ে নিয়মিত ভাবে স্কুল হোমওয়ার্ক থেকে শুরু করে যে কোনো কাজের জন্য এআই বন্ধু ব্যবহার করে। আর তেত্রিশ শতাংশ ছেলেমেয়ে তাদের প্রিয়বন্ধু হিসেবে এআই বন্ধুর সান্নিধ্য কামনা করে।
মার্চ এর ২০ তারিখে সারা বিশ্ব জুড়ে পালিত হলো 'আন্তর্জাতিক গল্প বলা দিবস'। ১৯৯১ সালে সুইডেনে প্রথম এই দিবসটির সূচনা হয় এবং ২০০৩ সাল থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, ল্যাটিন আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডায় এই দিবসটির গুরুত্ব ছড়িয়ে পরে। এখন সারা বিশ্বেই পালিত হয় গল্প বলা দিবস।
কিছু কিছু দেশ তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে, লোক মুখে শোনা এবং প্রচলিত জনপ্রিয় কিছু গল্প, এই গল্প বলা দিবসে বিভিন্ন উৎসব বা উদযাপনের মাধ্যমে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। এই দিনে বিভিন্ন গল্পকাররা একত্রিত হয়ে মৌখিক গল্প বলার শৈলী প্রদর্শন করে এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উপভোগ করে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের নিজেদের কৃষ্টি সম্পর্কে ধারণা দেয়।
এই দিবসটিতে গল্পকাররা তাদের নিজেদের জীবন, শৈশব বা নিজদেশী কোন লোকগাথা থেকে নেয়া সুন্দর সুন্দর কিছু গল্প সবাইকে শোনায়, সবার সাথে শেয়ার করে। এটি হতে পারে কোন বাচ্চাদের স্কুলে, কলেজে, লাইব্রেরি, থিয়েটার বা পার্কে। কিংবা হতে পারে বন্ধুদের আড্ডায়, কোনো ঘরোয়া অনুষ্ঠানে বা রাতের বেলায় বাড়ির ছোট্ট বাচ্চাটিকে ঘুম পাড়ানোর সময়। আমাদের দেশে গ্রামেগঞ্জে গল্প শোনার আসর বসে চাঁদনী রাতে, বাড়ির ছাদে বা উঠোনে, কিংবা পুকুর পাড়ে।
গল্প শোনা যেমন হতে পারে তরুণ ও কিশোর বয়সীদের জন্য খুব রোমাঞ্চকর একটি অভিজ্ঞতা। তেমনি এটা হতে পারে তথ্য আদান প্রদানের জন্য খুব শক্তিশালী একটি মাধ্যম। গল্পের বিষয়বস্তু মানুষকে আকৃষ্ট করে এবং মানুষকে অন্য রকম ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ গল্পের মাধ্যমে আমরা নিজেদের প্রকাশ করি, অন্যকে বুঝি এবং দুনিয়াকে দেখি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে। গল্প আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, স্মৃতি শক্তি প্রখর করে এবং মানসিক চাপ কমায়।
বর্তমান সময়ে গল্প বলার চল প্রায় একেবারেই উঠে যাচ্ছে। আর গল্প শোনার ধরনটাও যাচ্ছে পাল্টে। এই যুগে সবার হাতেই আছে স্মার্ট ফোন। ছোট থেকে বড় সবাই করে ওয়েব সারফিং অথবা ডুম স্ক্রলিং। কারো মুখ থেকে গল্প শোনার চাইতে, ইন্টারনেটে, ইউটিউবে বা ডিজিটাল স্টোরিটেলিংএ এই যুগের বাচ্চারা বেশী আগ্রহী। কারন এতে ভিজুয়াল দেখার আনন্দ বেশি পাওয়া যায়।
ধৈর্য ধরে গল্পের শেষটুকু শোনা বা দেখার কৌতূহলও ছেলেমেয়েদের অনেক সময় হয়না। তা ছাড়া দাদি, নানি বা পরিবারের বয়স্ক কারোর পাশে গোল হয়ে বসে ছোটদের গল্প শোনা ও অভিভূত হওয়া এখন দেখাই যায়না। স্ক্রিনের মধ্যে ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকা বা অনলাইনের অচেনা অন্ধকার জগতে নিজেদের নিমজ্জিত করে রাখা বাচ্চাদের প্রতিদিনকার রুটিনে পরিণত হয়েছে।
ছেলেমেয়েরা মানসিকভাবে যন্ত্রের উপর কেনো এতো নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? অনেক সময় মনে হয় যন্ত্রের সাথে এদের আত্মার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। আর তা হতে হতে এই বিবেক বিহীন যন্ত্র গুলোই তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হচ্ছে। যন্ত্র থেকে পাওয়া গল্পগুলো দেখতে বা শুনতে এরা বিশেষ ভাবে আগ্রহী। মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপন এখন আর জীবন পথে চলতে গিয়ে হয়না, বরঞ্চ হয় ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে, স্ক্রিনের মাধ্যমে। পরিবারের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মানুষের জীবন থেকে নেয়া গল্প শুনতে ছোটোরা চায় না, চায় ইউটুবার বা ইনফ্লুএন্সার এর অযৌক্তিক বানানো গল্প শুনতে। এতেই তারা আকৃষ্ট হয়।
আসল আর নকলের ভেদাভেদ কমে যাচ্ছে। খাঁটি ও কৃত্রিম এর পার্থক্য মানুষ বোঝেনা অথবা বুঝতে চায়না।
এই বছর গল্প বলার থিম ছিলো - লাইট ইন ডার্কনেস বা অন্ধকারে আলো। বর্তমানের জটিল ও সংকটময় সময়ে আশার আলো, প্রজ্ঞা ও মানব সমাজে গভীর সংযোগ প্রতিস্থাপন করার উদ্দেশ্যে এ বছরের প্রতিপাদ্য বা থিম ঠিক করা হয়। এই বছরের থিমটি খুবই সময় উপোযোগী এবং কালনির্ভর। আমাদের পৃথিবী এখন এক দারুণ সংকটময় সময় পার করছে। চারিদিকের মানুষ যখন দৈনন্দিন সমস্যায় জর্জরিত, তরুণ প্রজন্ম স্ক্রিন আর অনলাইনের সাগরে নিমজ্জিত, সারা বিশ্বে রাজনৈতিক টানাপড়েন ও যুদ্ধ বিগ্রহ, এমনকি আমাদের প্রিয় পৃথিবীর অস্তিত্ব ঝুঁকিপূর্ণ গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর প্রভাবে, সেখানে কিছু ভালো চিন্তা, ভালো গল্প, ভালো পরামর্শ দিয়ে আমরা একে অন্যকে টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারি। কঠিন জীবন সংগ্রাম পার করতে আমরা কারো না কারো গল্প থেকে পাথেয় নিতে পারি।আমরা যারা লেখালেখি করি, গল্প বানাই, তারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রকম দৃশ্য কল্পনা করি। এবারের গল্প বলা দিবসে আমার একটি ছোট গল্প বলে শেষ করছি। আমার পাঠকেরা এমন একটা দৃশ্য কল্পনা করুন।
-------------------------------------------------------------------------------------------------------------
একটা ছোট ছেলে এক জায়গায় বসে মন দিয়ে খেলছে। আশেপাশে কেউ নেই। শুধু একটি কম্পিউটার। আপনি তাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'তুমি একা একা খেলছো? একা একা খেলতে মন খারাপ লাগছে না? তোমার কোনো বন্ধু নেই?'
ছেলেটা মুখ তুলে অবাক বিস্ময়ে আপনার দিকে তাকিয়ে বলল, 'কে বলেছে আমার কোনো বন্ধু নাই? আমারতো অনেক গুলো বন্ধু।'
আপনি বললেন, 'তাই নাকি? ওরা কোথায়? নাম কি?'
ছেলেটি বলল, 'ওরা এখানে(কম্পিউটার দেখিয়ে)। সোরা, ভাইবস্, জেমিনাই, কোপাইলট, চ্যাটজিপিটি।'
আপনি ছেলেটির চাইতেও দ্বিগুণ বিস্ময়ে বললেন, 'ওরা তোমার বন্ধু? ওদের সাথে তুমি কি খেলো?'
ছেলেটি বড় একটি হাসি দিয়ে বলল, 'সোরা ও ভাইবস্ আমার খুব প্রিয় বন্ধু। আমি ওদেরকে আমার কোনো একটা ইচ্ছার কথা বলতেই, ওরা আমাকে একটা অ্যানিমেটেড ভিডিও বা মুভি বানিয়ে দেয়। আমি ওটা দেখি, আমার আর কোনো মন খারাপ লাগেনা। আর স্কুলের জন্যতো কোনো হোমওয়ার্ক করাই লাগেনা। চ্যাটজিপিটি সব করে দেয়। ও না পারলে আমি জেমিনাই বা কোপাইলট এর কাছে যাই।'
আপনি হতভম্ব হয়ে ভাবছেন ছেলেটিকে কি বলবেন। আপনি কিছু বলার আগেই ছেলেটি বলল, 'ওরা আমার প্রিয় বন্ধু। আমার বন্ধুরা আমাকে অনেক পছন্দ করে। তার থেকেও আমি ওদের বেশি পছন্দ করি। কারন ওদের ছাড়া আমার জীবন চলেনা।'
--------------------------------------------------------------------------------------------------------------
এই অন্ধকার রাস্তার শেষ মাথায় কি কোনো আলো আছে, নাকি মানব সভ্যতা ক্রমাগত যান্ত্রিকতার অন্ধকারে ডুবে যাবে?

শুরু হয় 'আমি' থেকেই। আমিই সমুদ্রের সেই একটি বিন্দু যা সম্মিলিত ভাবে সিন্ধু তৈরী করেছে। সুতরাং এই লেখাটি 'আমি কি করতে পারি' তা ভাবার এবং প্রয়োগ করার অনুপ্রেরণা দেবে। প্রযুক্তিকে ভাল কাজে লাগালে মানব জাতির ভালই হবে। যেমন এই লেখাটি আমি আমার মোবাইল ফোনেই পড়েছি। শিক্ষিকা হিসেবে আমিও মাঝে মাঝে AI ব্যবহার করি, তবে একটি গন্ডি পর্যন্ত, যেখানে আমিই প্রভু, আমিই ঠিক করি কতটুকু সাহায্য নেবো, যেভাবে অভিধান থেকে শব্দার্থ দেখি, কোন তথ্য যদি বিশদ ভাবে জানতে চাই, সে ভাবে। স্কুল, কলেজ এবং বাড়ীর বড়রা ছোটদের প্রযুক্তির সঠিক প্রয়োগ নির্ধারণ করে দিতে পারে কারণ এই বয়সেই তাদের শিক্ষা শুরু হয়।
ReplyDeleteএ আই বন্ধু হয়ে লেখাপড়া, কাজে-কর্মে সাহায্য করতেই পারে, কিন্তু তা জীবনের অভিজ্ঞতার পরিপূরক নয়। সূর্যোদয় ফোনের স্ক্রিনে ঘটে না, এমনকি জানালার কাচের ক্যানভাসেও আঁকা হয় না। দিগন্তের পানে না তাকিয়ে সূর্যোদয় উপভোগ করা কি সম্ভব?
ReplyDeleteভালো লাগলো।
ReplyDeleteQuite an intriguing topic. You have beautifully addressed my concerns regarding the impactful "AI" influence in our lives.
ReplyDeleteMy worry is whether at the end of the day it will enhance our overall intellectual capability or ultimately disable it.
Well that is yet to see