ফ্রেন্ডশিপ/ রিলেশনশিপ/... নাকি সিচুয়েশনশিপ
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই ভালোবাসা নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছা করে। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই দেখা যায় প্রেম, ভালোবাসা, ভালোলাগা নিয়ে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ভিডিও আরো কত কিছু। ফেব্রুয়ারি বা ভ্যালেন্টাইন মাসে এগুলো ঘন ঘন দেখা গেলেও, আসলে প্রেম বা ভালোবাসার কোনো নির্দিষ্ট মাস বা সময় নেই। এর স্থায়িত্ব কাল অনন্ত, সময়হীন। মানুষ যত কাল বাঁচবে ততকাল তার জীবনে প্রেম ও ভালোবাসা থাকবে, এমন একটা ধারণা আমাদের সবার মনেই আছে।
তবে ইদানিং কালের ছেলেমেয়েদের দেখে বা এইসব তরুণ প্রজন্মের ভালোবাসা সম্পর্কিত ধ্যানধারণা দেখে আমরা আগের জেনেরেশনের মানুষেরা কিছুটা শংকিত বোধ করছি। আমরা অবাক হচ্ছি দেখে যে, এরা কোনো ভাবেই কোনো দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়াতে চায়না। এরা ফ্রেন্ডশিপ বা বন্ধুত্ব পছন্দ করে ঠিকই, তবে তার থেকেও বেশি পছন্দ করে সিচুয়েশনশিপে থাকতে।
সিচুয়েশনশিপ...সেটা আবার কি?
সিচুয়েশনশিপ, বন্ধুত্ব ও গভীর প্রেমের মাঝামাঝি অবস্থিত, ধুসর একটি জায়গা। গুরুত্ব বিচারে এটি বন্ধুত্বের থেকে বেশি কিন্তু প্রেমের চাইতে কম। এই মাঝামাঝি অবস্থিত ধুসর জায়গাটিতে কোনো বাঁধা নেই, বন্ধন নেই। এই সম্পর্কে কোনো লেবেল নেই, একে অন্যকে দেয়া ওয়াদা নেই, নেই দুজনার স্বপ্নে ভরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
জেনেরেশন যেড বা যি প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা সিচুয়েশনশিপ স্থাপনে বিশেষ ভাবে আগ্রহী। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে এই ধারণার প্রথম প্রচলন হয়। তারপর এটা যি প্রজন্মের মধ্যে প্রচুর সাড়া জাগায় এবং ক্রমান্বয়ে তারা এই সম্পর্কে যাওয়া শুরু করে। নিজের ইচ্ছায় ওরা এই সম্পর্কে জড়ায়। এখানে থাকতে ওদের ভালো লাগে, আবার এখান থেকে চলে গেলেও ওদের কোনো সমস্যা হয়না। তাতে রিলেশনশিপ বা স্থায়ী সম্পর্ক বিচ্ছেদের কষ্ট পেতে হয়না।
এটা অনেকটা ঝটপট রান্না সেরে ফেলার মত একটা ব্যাপার। খিদা লেগেছে তাই কিছু একটা খেতে হবে। কিন্তু ঘন্টা ধরে রান্না করার সময় বা ইচ্ছা নাই। তাই ঝটপট একটা কিছু রান্না করে খেয়ে পেট ভরানো হলো। এতে অনেক সময় ব্যয় করে রান্না করার পর, খেতে ভালো না হওয়ার কষ্টও নেই।
সিচুয়েশনশিপ এর মধ্যে শারীরিক ও রোম্যান্টিক দুটো ব্যাপারই থাকে। তবে এটি এমন একটি ব্যবস্থা যাতে কোনো নির্ভরতা নেই, গোপনীয়তা নেই। নেই কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা। দুজন মানুষ, তারা প্রথম থেকেই জানবে যে তারা একে অন্যের সাথে থাকতে বা ঘুরতে ফিরতে পছন্দ করে। কিন্তু তারা একে অন্যের প্রতি অঙ্গীকার বদ্ধ নয়, প্রতিশ্রুতি বদ্ধ নয়। কোনো একদিন অন্য কাউকে ভালো লেগে গেলে তারা এই সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে সেই অন্য কারোর কাছে চলে যাবে। এতে কেউই মনে কষ্ট পাবেনা। কেউ কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবে না।
এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব কাল কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস, এমনকি বছর খানেকও হতে পারে। সেটা নির্ভর করবে ছেলেটা ও মেয়েটার উপর। তবে তারা দুজন নিজেদেরকে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড হিসাবে ভাবেনা, এবং সেটা বলে পরিচয়ও দেয়না। কাছাকাছি বা একসাথে থাকার কারনে তাদের মধ্যে মানসিক নৈকট্য ঘটে ঠিকই কিন্তু তারা পুরোপুরি একে অন্যের উপর মানসিক ভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে না। সর্বোপরি, দুজনের মধ্যে একে অন্যের ব্যাপারে কোনো উচ্চাশা থাকেনা। যতদিন তারা একসাথে থাকবে ততদিন একে অন্যের কাছ থেকে সবরকম সুবিধা পাবে ও নিবে। তাতে করে দুজনের কারোর মনে হবেনা যে তারা একে অন্যকে ঠকিয়েছে, বা চিট করেছে বা ধোঁকা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া জেন যি ছেলেমেয়েদের মধ্যে এর চর্চাটা খুবই জনপ্রিয়। তারা এটাকে আধুনিক ডেটিং বা ক্যাজুয়াল ডেটিং এর সমকক্ষ মনে করে। ইউগভ নামক কোম্পানি গত বছর ২০২৫ এ প্রায় এক হাজারেরও বেশি আমেরিকান তরুণতরুণীর উপর একটি জরিপ চালায়। এতে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৪ বছরের আমেরিকান নারি/পুরুষ এর অর্ধেক শতাংশ (৫০%) অন্তত জীবনে একবার সিচুয়েশনশিপে থেকেছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা জেন যি এর সিচুয়েশনশিপ প্রীতির কারন হিসেবে নানা রকম বিষয়ের কথা উল্লেখ করেছে। সম্পর্কের গভীরে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হওয়া, জীবনে অতিরিক্ত ব্যস্ততায় ডুবে থাকা, অনেক দেখে বেছেও পারফেক্ট জীবনসঙ্গী খুঁজে না পাওয়া, এবং সর্বোপরি, বিভিন্ন ডেটিং অ্যাপের মাধ্যমে সবসময়ই পছন্দের কাউকে না কাউকে খুঁজে বের করা - এই সব বিষয়গুলোকে উল্লেখযোগ্য কারন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ যুগের ছেলেমেয়েরা সব কিছুকেই ক্যাজুয়াল রাখতে চায়, কোনো কিছুর গভীরে যেতে চায়না। তাদের বিচারে সিচুয়েশনশিপ, সম্পর্কে ঢোকার একটি উত্তম ব্যবস্থা।
যে কোনো ভালোর যেমন মন্দ দিক থাকে, তেমনি যে কোনো সহজ ব্যবস্থারও কিছু জটিল পরিণাম থাকে।
দীর্ঘদিন সিচুয়েশনশিপে থাকলে নিজের সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস কমে যাওয়ার প্রচুর সম্ভাবনা থাকে। এতে করে নিজেকে অনেক ফালতু বা ফেলনা মনে হতে পারে কারন একজন সব সময় জানবে যে সেই তার সঙ্গীর একমাত্র পছন্দ নন। এছাড়া, একজনের মনে সব সময় এক ধরনের ভীতি বা অস্থিরতা কাজ করতে পারে এই ভেবে যে তার সঙ্গীটি তার সম্পর্কে আসলে কি ভাবছে বা তার জানার বাইরে কি করছে। যেহেতু সিচুয়েশনশিপে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসীমা নেই, এই সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেই। সেটাও ছেলেমেয়েদের মনঃক্ষুণ্ণের কারন হতে পারে। আগের থেকে কোনোরকম ইঙ্গিত দেয়া ছাড়াই এই সম্পর্ক হঠাত ভেঙ্গে যেতে পারে। সে কারনেও ছেলেমেয়েদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হয়।
সিচুয়েশনশিপের প্রধান ভিত্তি, সম্পর্কের দুজনকেই একই মানসিক অবস্থানে থাকতে হবে। কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্ক কখনো সমান্তরালে চলেনা, একটু উঁচুনিচু থাকে। দুজনের মধ্যে একজন একটু বেশি দিবে তো অন্যজন একটু বেশি নিবে। কি ধরনের সঙ্গী আমার পছন্দ এটা জানার পাশাপাশি আরো বোঝা প্রয়োজন, আমি নিজে কি ধরনের সঙ্গী হবো? - এই চিন্তাটাই তারা ভুলে যায়।বিশেষ করে মেয়েরা যেহেতু ছেলেদের চাইতে একটু বেশি ইমোশোনাল, দীর্ঘ সময় একসাথে থাকার পর তাদের মনে হত পারে, আমি আসলে কি? - না বেস্ট ফ্রেন্ড, না গার্ল ফ্রেন্ড, না প্রেমিকা, না স্ত্রী। তবে আমি কি? সঙ্গীর কাছ থেকে কিছু একটা লেবেল পেতে তাদের মন চায়। কিন্তু সঙ্গীটি যদি সেটি দিতে রাজী না থাকে তাহলে সম্পর্ক সেখানেই শেষ। কাজেই সিচুয়েশনশিপ ব্রেকআপও ওদের মধ্যে প্রায়শ ঘটে।
এবার আসি, মূল বিষয়টিতে। যেহেতু ফেব্রুয়ারি মাসে ভালোবাসা নিয়ে কিছু লিখতে চেয়েছিলাম।
মানব হৃদয় খুব রহস্যময় একটি জায়গা। এখানে কখন কার অবস্থান হবে, কে জায়গা পাবে কে হারাবে, কে পাকাপোক্ত আসনে বসবে, তা আগে থেকে আমরা জানিনা। হৃদয় নামক রহস্যময় কুঠুরিটির চাওয়াপাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই পালটে যেতে পারে। দুটি মানুষ একসাথে থাকতে থাকতে একজনের মনে অন্যের প্রতি ভালো লাগা থেকে ভালোবাসার জন্ম হতে পারে। আর সেটা হতেই পারে। কারো প্রতি ভালোবাসা অনুভব করা কোনো অপরাধ নয়। দুনিয়ার সবচাইতে সুন্দরতম অনুভূতির নাম ভালোবাসা।
ভালোবাসা যদি দুই তরফায় জন্ম নেয়, তাহলে সিচুয়েশনশিপ বদলে রিলেশনশিপ আখ্যা পাবে। আর যদি ভালোবাসা হয় এক তরফার বদলে যাওয়া অনুভূতি, তাহলে কি হবে?
সে তার অব্যক্ত ভালোবাসার কথা কখনোই মুখ ফুটে বলতে পারেনা। কারন ভালোবাসার কথা প্রকাশ
করতেই সিচুয়েশনশিপের ইতি ঘটে, সেই সাথে ইতি ঘটে ভালোবাসার মানুষটির। মানুষটির একদিন নতুন কাউকে পছন্দ হয় এবং সে তাদের সিচুয়েশনশিপ ছেড়ে নতুন একজনের কাছে চলে যায়। তখন ভালোবাসায় সিক্ত অপরজনের হৃদয় ভেঙ্গে খানখান হয়ে যায়। সিচুয়েশনশিপের শর্ত অনুযায়ী সে তার এক তরফা ভালোবাসার দাবি প্রতিষ্ঠার কোনো অবকাশ পায়না।
লেখাটা পড়ে আপনার আমার মত সনাতনী চিন্তাধারার মানুষের মনে হবে - এইসব শর্তহীন, উদ্দেশ্যহীন সিচুয়েশনশিপ ব্যবস্থার কি দরকার? কেনো খামোখা এতো কষ্ট পাওয়া?
কয়দিনের এই দুনিয়া। ভালোবাসাহীনতায় কে বাঁচিতে চায়?💘💞

সিচুয়েশনশিপ কি তাহলে শুধু সুবিধাবাদীদের জন্য? নিবেদিতপ্রাণের পক্ষে ভালোবাসায় মানসিক ভারসাম্য রাখা জটিলতর হয় যদি অন্যপক্ষ সুবিধাবাদী হয়। কেবল বিশ্বাসহীনতায় বিশ্বাসীরাই সিচুয়েশনশিপে লাভবান হতে পারে।
ReplyDelete